আটকে গেলো ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমের পদোন্নতি

0
130
#

আলাউদ্দিন ওয়াজেদ:

প্রশাসনে উপসচিব পদে সম্প্রতি পদোন্নতি দিল সরকার। পদোন্নতির ক্ষেত্রে বিসিএসের ২৭তম ব্যাচকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের ২৪০ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ভেজাল ও দুর্নীতি বিরোধীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সারাদেশে সবার প্রিয় মানুষ হিসাবে সুনাম অর্জন করলেও আটকে গেলো র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারোয়ার আলমের পদোন্নতি।

#

গত রোববার প্রশাসনে সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি পান ৩৫৮ কর্মকর্তা।এর মধ্যে ৩৩৭ জনকে পদোন্নতি দিয়ে দুটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পদোন্নতি পাওয়া বাকি কর্মকর্তারা শিক্ষা ছুটিতে আছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ৩৫৮ জনের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ২৭৮ জন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৭তম ব্যাচের ২৪০ জন। বাকি ৩৮ জন অন্যান্য ব্যাচের। এছাড়া অন্যান্য ক্যাডার থেকে পদোন্নতি পেয়েছেন ৮০ কর্মকর্তা।

বিসিএস ২৭তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে ২০০৮ সালের নভেম্বরে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন সারোয়ার আলম। ২০১৪ সালের ১ জুন সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে পদোন্নতি মেলেনি তার। সে অনুযায়ী এ পদে প্রায় সাত বছরসহ মোট ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রশাসন ক্যাডার হিসেবে কর্মরত আছেন সারোয়ার আলম।
যা পদোন্নতির শর্ত পূরণ করে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় অভিযোগ নেই। বরং নানা সাহসী অভিযানের কারণে বিভিন্ন সময় প্রশংসা কুড়িয়েছেন এই কর্মকর্তা। তবুও তার পদোন্নতি মেলেনি। হতাশ সাধারন মানুষ। জনমনে নানা প্রশ্ন।

মেধা কোটায় চাকুরি পাওয়া ২৭তম ব্যাচের মেধা তালিকায় সামনের দিকে তার সিরিয়াল থাকলেও মেলেনি পদোন্নতি। তারপরের ১৫০ জনেরও বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আরেক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসনে উপসচিব পদে পদোন্নতির জন্য নিয়মিত হিসেবে ২৭তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ২০২০ সালে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গত রোববার পদোন্নতি দেওয়া হলেও এ ব্যাচের ৩০ কর্মকর্তা পদোন্নতি মেলেনি। এর মধ্যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলমও নাম রয়েছেন।
যে ভাবে মূল্যায়ন করা হয় পদোন্নতিতে: সরকারের উপসচিব, যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২’ অনুযায়ী, উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সিনিয়র সহকারী সচিব পদে পাঁচ বছর চাকরিসহ সংশ্লিষ্ট ক্যাডারের সদস্য হিসেবে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ১০০ নম্বরের (মূল্যায়ন) মধ্যে অন্তত ৮৩ নম্বর পেতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতার জন্য ২৫ নম্বর, বিগত পাঁচ বছরের বার্ষিক বা গোপনীয় প্রতিবেদনের ওপর গড়ে ৩০ নম্বর, চাকরিজীবনের শুরু থেকে বিগত পাঁচ বছরের আগ পর্যন্ত সব বছরের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনের জন্য গড়ে ২৫ নম্বর, সামগ্রিক চাকরিজীবনে বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদনে কোনো বিরূপ মন্তব্য না থাকলে বোনাস নম্বর হিসেবে ১০ নম্বর এবং সামগ্রিক চাকরিজীবনে কোনো শাস্তি না থাকলে ১০ নম্বর মিলিয়ে মোট ১০০ নম্বরের মাধ্যমে উপসচিব পদে পদোন্নতির মূল্যায়ন হয়।

যা বলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম: পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি পরে অনেকেই আমাকে ফোন দিয়ে জানতে চেয়েছেন। আমার পদোন্নতি হয়নি বলে, অনেকেই বিশ্বাস করতে পারছেন না বলে আমাকে জানিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তারা অবাক হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, আমি সবসময় জনগণের জন্য কাজ করেছি। যেসব জায়গায় জনগণ প্রতারিত হচ্ছিল, সেগুলো ধরে ধরে কাজ করে মানুষের মনে স্থান করতে পেরেছি। সততা, কর্মদক্ষতা কোনোদিক দিয়েই পিছিয়ে ছিলাম না। আমার প্রমোশন হয়নি, এটা কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না।
চাকরিজীবনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যাুয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়েছেন তাদের বেশিরভাগই চাকরিজীবনে পদে পদে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। এ দেশে অন্যা য়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যাজয়। গত সোমবার (৮ মার্চ) ফেসবুকে আবেগঘন এক স্ট্যাটাস দেন সারোয়ার আলম। সেখানে তিনি লেখেন, ‘চাকরিজীবনে যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্যাুয়, অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়েছেন তাদের বেশিরভাগই চাকরিজীবনে পদে পদে বঞ্চিত ও নিগৃহীত হয়েছেন। এ দেশে অন্যানয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই অন্যািয়!’

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিছুর রহমান মিঞা বলেন, ‘আমার জানা মতে যারা যোগ্য তারা সকলেই পদোন্নতি পেয়েছেন। বাকিদের বিষয়ে মন্তব্য করার অধিকার আমার নেই।

কাল হলো হাজী সেলিমের বাড়িতে অভিযান: প্রশাসনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বলছে, ২০২০ সালের অক্টোবরে মদ্যপান ও ওয়াকিটকি ব্যবহার করায় সংসদ সদস্য (এমপি) হাজী সেলিমের ছেলে ইরফান সেলিমের বাসায় অভিযান চালায় র্যাবব। সে সময় ইরফান সেলিমকে দুটি অভিযোগে এক বছর করে কারাদণ্ড দেন সারোয়ার আলম। এ কারণে তার পদোন্নতি আটকে যেতে পারে।

আলোচিত অভিযান: ২০১৫ সাল থেকে র্যা বের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সারোয়ার আলম। তবে প্রথম আলোচনায় আসেন ২০১৪ সালে। ফার্মগেটের ওভারব্রিজ বাদ দিয়ে সরাসরি যারা রাস্তা পার হচ্ছিলেন, তাদের নামমাত্র জরিমানা করে সচেতন করেছিলেন তিনি।

তার পরিচালিত অভিযানের মধ্যে অন্যতম হলো ২০২০ সালে হাজী মোহাম্মদ সেলিমের ছেলের বাসায় অভিযান, রিজেন্ট হাসপাতালের ভুয়া করোনা রিপোর্ট তৈরির বিরুদ্ধে অভিযান এবং ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ফকিরাপুলে ক্যাসিনোর আসরে অভিযান।

২০১৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদে অভিযান চালান তিনি। ১৪২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেন। উদ্ধার করা হয় ক্যাসিনো থেকে উপার্জিত অবৈধ ২৪ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর নিকেতনে যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের অফিসে অভিযানে যায় র্যাথব। সেখানেও ছিলেন সারোয়ার আলম। অভিযানে জি কে শামীমের কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়ে অবৈধভাবে উপার্জিত নগদসহ ২০০ কোটি টাকার এফডিআর, বিদেশি ডলার, মদ ও অস্ত্র উদ্ধার করেন।

২০১৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার হাতিরপুলে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য নকল করে বাংলাদেশে উৎপাদনের কারখানায় হানা দেন সারোয়ার আলম। হাতেনাতে ধরে সিলভান ট্রেডিং কোম্পানি ও টোটাল ফার্মাকে ৪০ লাখ টাকা জরিমানা এবং দুজনকে জেল দেন তিনি।

ভয়ংকর কিশোর গ্যাং: ঢাকায় যখন বিভিন্ন কিশোর অপরাধী ও গ্যাংয়ের হাতে হত্যাকাণ্ড, চুরি-ছিনতাই বেড়ে যায়, তখন তাদের শনাক্তে অভিযান চালান সারোয়ার আলম। গত বছরের ৩১ জুলাই রাজধানীর শ্যামলী, শিশুমেলা, কলেজ গেট অভিযান পর ২৯ কিশোরকে ছয় মাসের জন্য কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

ডেঙ্গু পরীক্ষায় অতিরিক্ত ফি: ২০১৯ সালের জুলাই মাসে সারাদেশে যখন ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু ও সিবিসি পরীক্ষায় ইচ্ছামতো ফি আদায় করতে থাকে। সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে অভিযান শুরু করেন সারোয়ার আলম। ৩১ জুলাই ডেঙ্গু পরীক্ষায় সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি নেওয়া এবং টেস্ট না করে প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট দেওয়ায় পল্টন ও ফকিরাপুল এলাকার চারটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাঁচজনকে জেল ও জরিমানা করে প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেন সারোয়ার আলম।

ভুয়া কারখানায় অভিযান: নকল কসমেটিকসের বিরুদ্ধে চকবাজার, কেরানীগঞ্জ ও ডেমরা এলাকায় কমপক্ষে ১২টি অভিযান চালান সারোয়ার আলম।

বাদামতলী ও কারওয়ান বাজারে একাধিক অভিযান চালান তিনি। এ সময় কেমিক্যাল দিয়ে কাঁচা আম হলুদ করে বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ খেজুর বিক্রির চিত্র উঠে আসে সবার সামনে।

চাঁদাবাজ হাতি: ২০১৯ সালের মে মাসে কাওরান বাজারে একটি অভিযান চালানোর সময় হাতি দিয়ে মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজির চিত্র চোখে পড়ে সারোয়ার আলমের। তখনই দুই হাতি ও মাহুতকে থামার নির্দেশ দেন তিনি। তবে মাহুত না থেমে দৌড়াতে থাকেন, পেছনে দৌড়ান তিনিও। অবশেষে হাতিরঝিলে গিয়ে আটকান তাদের। দুজনকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন তিনি।

অ্যাপোলো, ইউনাইটেড, পপুলার হাসপাতালে অভিযান: ২০১৮ ও ২০১৯ সালজুড়ে হাসপাতালে অভিযান চালান সারোয়ার আলম। অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ রিএজেন্ট (রাসায়নিক উপাদান) ব্যবহার ও অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রির অভিযোগে গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালকে ২০ লাখ টাকা, অ্যাপোলো হাসপাতালকে পাঁচ লাখ ও পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন তিনি।

এছাড়া একই অভিযোগে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতাল, শমরিতা হাসপাতাল ও বাংলাদেশ স্পাইন হাসপাতালকে ১৮ লাখ টাকা জরিমানা করেন সারোয়ার আলম।

নানা অনিয়মের অভিযোগে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালকেও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেন তিনি।

সারোয়ার আলমের এমন সাফল্যের জন্য ২০১৯ সালের ১২ মে তার মাকে ‘গরবিনী মা’ পদক পরিয়ে দেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

অসাধারণভাবে কাজ করে চলা সারোয়ার আলমকে ২০২০ সালের ৯ নভেম্বর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে বদলি করা হয়।

Facebook Comments

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here