নান্দনিকতার বদলে ফুটপাত দখল

0
179
#

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় গড়ে তোলা ফ্লাইওভারগুলোর ওপর দিয়ে গাড়ি চলাচল করলেও নেই কোনো নান্দনিকতা। আর এসবের নিচের অবস্থা যাচ্ছেতাই। ফ্লাইওভারের নিচে রয়েছে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা গাড়ি পার্কিং, দোকান| আবার অনেকই ঝুপটি ঘর তুলে বসবাস করছে। সেখানে চলছে অসামাজিক কাজ। অথচ উন্নত দেশে গুলোর মত হ্ওয়ার কথা। কিন্তু নেই আধুনিক ও নান্দনিক রূপ।

#

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে সিটি করপোরেশন এলাকায় সড়কের ওপর প্রায় ২৯ কিলোমিটারজুড়ে থাকা ৭টি ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা নিয়ে যেন ভাবনা-পরিকল্পনা নেই কারোরই। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ফ্লাইওভার নির্মাণ প্রাক সমীক্ষায় এবং পরবর্তীতে ব্যবস্থাপনায় বেশ দুর্বলতার কারণে মূল্যবান এসব জায়গা অব্যবহৃত বা অকাজে ব্যবহার হচ্ছে। নির্মাণাধীন মেট্রোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচের খালি জায়গারও একই অবস্থা হওয়ার শঙ্কা জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

জানা গেছে, উন্নত দেশের ফ্লাইওভারগুলোর রঙিন সাজসজ্জা ও লাইটিং থাকে চোখে পড়ার মত। আর সেগুলোর নিচের খালি জায়গায় শহরবাসীর জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা থাকে। আবার অনেক দেশে ফ্লাইওভারের নিচে ফুল ও ফলের বাগান করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ফ্লাইওভারগুলোতে নেই বিদ্যুৎ, লাইটিং। নেই আধুনিক কোনো ব্যবস্থা। আছে শুধু ভূতুরে পরিবেশ। আপরাধের অভায়রন্য। সন্ধ্যার পর থেকে সাধারন মানুষ চলাচল করতে আতকে উঠে। কেউ কেউ আবার খুপড়ি ঘর বানিয়ে বহাল তবিয়তে বসবাসও করছেন। আর প্রতিটির নিচেই রয়েছে অগণিত দোকান।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, রাত নামলেই রাজধানীর অধিকাংশ ফ্লাইওভারের নিচের অংশ বিপদজনক হয়ে ওঠে। সারা দিন রাজপথ দাপিয়ে গণপরিবহণগুলোর রাতের ঠিকানা এখানে। আর এর ফাঁকেই চলে নেশাসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ীর শুধু ওয়ারী অংশেই অন্তত ৪৭টি পরিবারের বসবাস। এসব দখলদারিত্বকে অবৈধ বললেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নগর কর্তৃপক্ষ। শুধু মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারেই নয়, ২৯ কিলোমিটার নিয়ে গড়ে ওঠা সাতটি ফ্লাইওভার আর ফুটপাত দখল করে বিভিন্ন প্রকারের দোকানের পসরা নিয়ে বসেছে অনেকেই। আবার কোনো স্থানে সিটি করপোরেশনের ময়লার স্তুপ করা হয়েছে।

রাজধানীর মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচে প্রায় দুই শতাধিক অস্থায়ী দোকান রয়েছে। এর মধ্যে আছে ভাতের হোটেল, চায়ের দোকান, জুতার দোকান ইত্যাদি। রয়েছে আবর্জনার ঢিবি। প্রতিটি দোকানে দৈনিক ও মাসিক চাঁদা দিয়েই ব্যবসা করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ফুলবাড়িয়ায় রাস্তা দখল করে খাবারের দোকান আবার কিছু জায়গায় রিকশাস্ট্যান্ড  গড়ে তোলা হয়েছে। টিকাটুলী এলাকায় ফ্লাইওভারের নিচে ছিন্নমূল মানুষের বসবাস। শনির আখড়া-যাত্রাবাড়ীতে বসেছে ফলের দোকান, বঙ্গবাজার থেকে নিমতলী গেটে ঘোড়ার বিষ্ঠা আর পাশের মুরগির বাজারের বর্জ্যের দুর্গন্ধ। তাই সাধারণ পথচারীদের জন্য চলাচলের রাস্তা যেন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ওয়ারী এলাকার বাসিন্দা মেহেদি হাসান বলেন, ‘গুলিস্তানে ফ্লাইওভারের নিচে জুতার দোকানের কারণে যানজট লেগেই থাকে। আবর্জনার দুর্গন্ধে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে চলাচল করা প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। আমাদের সাধারণ মানুষের অসুবিধা কারো চোখে পড়ে না।’

মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার ছাড়াও রাজধানীর মালিবাগ-মৌচাক, কুড়িল ও মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের ফাঁকা জায়গা দখল করে ভাতের হোটেল, গাড়ির গ্যারেজ, কুঁড়েঘর তৈরি করে চলছে ভাড়া খাটানোর জমজমাট ব্যবসা। কর্তৃপক্ষের অবহেলায় মাদকসেবী, ছিন্নমূল মানুষের আস্তানা আর ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে এই তিন ফ্লাইওভারের নিচের খালি জায়গা। মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের মালিবাগ ও মগবাজার মোড়ে গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ টেম্পোস্ট্যান্ড। মালিবাগ রেলগেট ও রাজারবাগে বিভিন্ন পরিবহনের টিকিট কাউন্টার। এ সব স্থানে সব সময় লেগে থাকে যানজট।

এছাড়া মগবাজার রেলগেটে ফ্লাইওভারের নিচে জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে মোটসাইকেলের গ্যারেজ। মগবাজার হয়ে বাংলামোটর পর্যন্ত ফ্লাইওভারের নিচের অংশ গাড়ির শোরুমগুলোর দখলে রয়েছে। রাজারবাগ এবং পুলিশের বিশেষ শাখা অফিসের সামনে ফ্লাইওভারের নিচের অংশে পুলিশের গাড়ি রাখার ফলে অস্থায়ী যানজটের সৃষ্টি হয় প্রায়ই। কাকরাইলে এসএ পরিবহনের কাউন্টার, কর্ণফুলী মার্কেটের সামনে ইউটার্ন ও শান্তিনগর বাজারের সামনে অবৈধ গাড়ি পার্কিংয়ের ফলে ফ্লাইওভার থেকে নেমে যানজটে পড়তে হয় নগরবাসীকে। সিএনজি ও পেট্রল পাম্পের কারণে মগবাজার, মালিবাগ ও রাজারবাগে যানজট লেগে থাকে সব সময়। নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা জমে গেছে ফ্লাইওভারের পানি নিষ্কাশনের নালাগুলোয়। জমছে পানি।

যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বেশ কিছু দিন হবে মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারে সড়কবাতি জ্বলে না। রাতের বেলা হেডলাইট জ্বালিয়ে ঝুঁকিতে যাতায়াত করতে হয় আমাদের। জ্বলে না ট্রাফিক সিগন্যালের লাইটও।

কাপ্তান বাজার এলাকার বাসিন্দা শারমিন সুলতানার দাবি, ‘বিভিন্ন দুর্গন্ধের কারণে কাপ্তান বাজার এলাকায় সবসময় নাক-মুখে হাত রেখে যাতায়াত করতে হয়। ফ্লাইওভারের নিচের অংশে এখন দেয়াল তুলে মুরগির দোকান ও খাবারের হোটেল বসানো হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে মুরগি বোঝাই ট্রাকের কারণে তো চলাচলই করাই যায় না।’

 

নগর পরিকল্পনাবিদ খন্দকার নিয়াজ বলেন, ফ্লাইওভারের নিচের জায়গাগুলো কাজে লাগানোর জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে তা এখনো ঠিক করা হয়নি।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিন বলেন, ফ্লাইওভারের নিচের জায়গারগুলো বেদখল করে রেখেছে। তবে এসব স্থানগুলো কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ‘পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য ভবন নির্মাণ হবে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে’।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, শহরের বুকে অত্যন্ত মূলবান এসব জায়গায় হতে পারে নান্দনিক পার্ক, হকারদের কর্মসংস্থান এবং পথশিশুদের বিনোদন কেন্দ্র। রাজধানীর ফ্লাইওভারগুলোর নিচের জায়গাকে পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার করতে নগর পরিকল্পনাবিদদের পক্ষ থেকে একটি নকশা তৈরি করা হয়েছে।

বুয়েট’র স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক এম. জাকিউল ইসলাম বলেন, ফ্লাইওভারগুলো নির্মাণ হয়েছে আধুনিকতার আদলে। ভারত, কানাডা, নেদারল্যান্ডস, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়েছে। যেখানে আছে পার্ক, লাইব্রেরি, জলাশয়সহ নানা আয়োজন। কিন্তু আমাদের এখানে জায়গা থাকলেও সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, মানুষের জন্য চলাচলের জায়গা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা খুবই জরুরি। যাতে করে সবাই যানজট মুক্ত চলাচল করতে পারে। এ বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব নিতে হবে।

সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে ফ্লাইওভারের গুরুত্ব সম্পর্কিত এক গোলটেবিল বৈঠকে ফ্লাইওভারের নিচের জায়গা দখল প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী এম.এ মান্নান বলেছিলেন, ফ্লাইওভারের সুবিধা আমরা সবাই ভোগ করছি। নিচের জায়গা দখল করে নরক বানিয়েছে।

Facebook Comments

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here