বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সংকট উত্তরণে পদক্ষেপ

0
167
#

সাজ্জাদুল হাসান

মহান বিজয়ের এই মাসে একটি সুখবর দিয়ে শুরু করতে চাই। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস তার বহর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এ মাসেই যোগ করতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন ও অত্যাধুনিক একটি ড্যাশ ৮-৪০০ যাত্রীবাহী বিমান।

#

আশা করা যায়, আগামী দুই মাসের মধ্যে আরো দুটি একই ধরনের নতুন বিমান আমাদের উড়োজাহাজ বহরে সংযোজিত হবে। উল্লিখিত তিনটি বিমান যুক্ত হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস লিমিটেডের বহরে উড়োজাহাজের সংখ্যা হবে ২১টি, যার ১৬টি নিজস্ব ও পাঁচটি লিজকৃত।

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে বিমানের নিজস্ব ১৬টি উড়োজাহাজের ১৫টিই কেনা হয়েছে সম্পূর্ণ নতুন অবস্থায় এবং সরাসরি বিমান নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং ও কানাডার বোম্বার ডিয়ার কোম্পানি থেকে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি সাপেক্ষে টরেন্টো, চেন্নাই, কলম্বো, মালে, নিউ ইয়র্ক ও টোকিওতে বিমানের ফ্লাইট চালু/পুনঃপ্রবর্তন করার পরিকল্পনা রয়েছে এবং সে হিসেবে কার্যক্রম অব্যাহত আছে। আশা করা যায়, নতুন বছরের শুরুতেই কিছু কিছু নতুন রুটে বিমান তার ডানা প্রসারিত করবে।

উল্লেখ্য যে, বিমান আজ ৫৩টি দেশের সঙ্গে আকাশ পরিবহনসেবা চুক্তিতে সম্পৃক্ত। এসব চুক্তির আওতায় বিমানের দিগন্ত আরো প্রসারিত হবে বলেই আমরা বিশ্বাস করি।

এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির বর্তমান অবস্থা ও বিমান

বাংলাদেশ এয়ারলাইনস :

করোনা মহামারির কারণে চলতি বছর বিশ্বের এয়ারলাইনস ইন্ডাস্ট্রির ৮ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ক্ষতি হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন IATA। বিভিন্নপত্র পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের সব নামিদামি বিমান সংস্থা, যেমন—ক্যাথে প্যাসিফিক, কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটস বিভিন্ন ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে। বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া রুটে জানুয়ারি মাসে যাত্রীসংখ্যা ১৫ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৫৮ শতাংশ যাত্রীসংখ্যা কমে যায়।

করোনাকালে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিমানকে স্থায়ী পরিচালনা ব্যয়, উড়োজাহাজের ঋণের কিস্তি, উড়োজাহাজের লিজের ভাড়া এবং উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে।

ফলে বিমান নজিরবিহীন তারল্য সংকটে পতিত হয়েছিল। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ও বিমান ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ব্যয় সংকোচন পদক্ষেপ গ্রহণ করায় বিমানের সেই আর্থিক সংকট অনেকটাই কেটে গিয়েছে। এপ্রিল ২০২০ থেকে শুরু করে নভেম্বর ২০২০ পর্যন্ত ক্রমাগতভাবে এবং আশাব্যঞ্জক হারে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে, যা বিমানের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে মজবুত করেছে।

করোনাকালে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা :

বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে করোনা মহামারিতে আটকে পড়া বাংলাদেশিদের নিয়ে ১৫টি নতুন গন্তব্যে, যথা—পর্তুগাল, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিশর, লেবানন, গ্রিস, স্পেন, রোম, জাপান, মালদ্বীপ, বাহরাইন, হংকং, বোম্বে, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাইয়ে বিমান মোট ৩৭টি ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে অক্টোবর ২০২০ পর্যন্ত মোট ২৫ হাজার ৭৬৬ জনযাত্রীকে পরিবহন করেছে, যা এক নতুন মাইলফলক।

এসব দেশে নিয়মিত ফ্লাইট না থাকায় বিভিন্ন সাপোর্ট সার্ভিস নিশ্চিত করতে গিয়ে যে সমন্বয় কার্যক্রমের প্রয়োজন হয়, তা অত্যন্ত সুচারূরূপে পালন করেছে বিমানের বিভিন্ন শাখাসমূহ। লেবাননে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্দা ও জোড়া বিস্ফোরণের প্রেক্ষাপটে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ দেশটি থেকে ফিরতে চাইছিলেন।

বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রায় এক মাস নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোট ১৪টি ফ্লাইট পরিচালনার মাধ্যমে বৈরুত থেকে ৬ হাজার ৬৯৭ জন আটকে পড়া বাংলাদেশিসহ মোট ২২ জনের মৃতদেহ ন্যূনতম খরচে দেশে ফেরত এনেছে বিমান।

সঠিক পরিকল্পনা ও সময়োচিত সাহসী পদক্ষেপে পরিচালিত এসব ফ্লাইট করোনাকালে রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে এ ফ্লাইটসমূহ বিশেষ অবদান রেখেছে। করোনায় চরম বিপর্যয়গ্রস্ত চীনের উহান থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্ধারকার্যে ৩১ জানুয়ারি ২০২০-এ বিমানই প্রথম একটি ফ্লাইট পরিচালনা করে।

জাতিসংঘ শান্তি-মিশনে ফ্লাইট পরিচালনা :

আমরা অনেকে জানি যে, জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী প্রেরণের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ প্রায়শই সর্বোচ্চ স্থানটি দখল করে থাকে। কিন্তু জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী কার্যক্রমের ইতিহাসে এ বছরই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের বহন করতে আমাদের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চার্টার্ড করেছে জাতিসংঘ।

বিষয়টিকে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করে জাতিসংঘের বাংলাদেশ মিশন জানিয়েছে, তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অমূল্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই বাংলাদেশের শান্তিরক্ষী পরিবহনে দেশটির নিজস্ব বিমান ভাড়া করা হয়।

এখানে উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রধানের বিশেষ আগ্রহের কারণেই জাতিসংঘে শান্তিরক্ষী কার্যক্রমে বিমানের প্রথম অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় এ বছরের মে মাসে। বিমানবাহিনীর শান্তিরক্ষীদের মধ্য আফ্রিকায় পরিবহনের মাধ্যমে বিমানের এ নতুন ইতিহাস রচিত হয়েছে।

বিমান ইতিমধ্যে ডিসেম্বর ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী ও বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যদের নিয়ে জাতিসংঘ শান্তি মিশনের ১৭টি ফ্লাইট পরিচালনা করে মালি, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, মধ্য আফ্রিকান রিপাবলিক ও সাউথ সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে পৌঁছে দিয়েছে ৩ হাজার ৪১১ জন শান্তিরক্ষীকে এবং বাংলাদেশে ফেরত এনেছে ৩ হাজার ৫৯ জন শান্তিরক্ষী।

সংঘাতপূর্ণ এই দেশগুলোতে সফল ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে বিমানের বৈমানিকসহ সব শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী অত্যন্ত দক্ষতা, পেশাদারিত্ব এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

বিশ্বব্যাপী চলমান করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থাকার পরও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এই সাহসী পদক্ষেপ বিশ্বে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বিমানের পেশাদারিত্বের ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। বিমান তার বৈচিত্র্যময় ব্যাবসায়িক কর্মকাণ্ড ও দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার কর্তৃক প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১ হাজার কোটি টাকা ঋণের অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে অন্যান্য এয়ারলাইনসের মতো কর্মী ছাঁটাইয়ের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করেও সফলতার সঙ্গে কোভিড-১৯ অবস্থার মোকাবিলা করে যাচ্ছে।

আমরা অবশ্যই বিশ্বাস করি, এ দুর্যোগ সাময়িক এবং অচিরেই এ সংকটের উত্তরণ হবে এবং বিমান তার পাখা মেলবে বর্তমান ও নতুন গন্তব্যের জন্য।

পরিশেষে, সম্মানিত যাত্রীসাধারণ ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছে বিনয়ের সঙ্গে দু-একটা কথা বলতে চাই। জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনস হিসেবে বিমান আমাদের সবার। বছর শেষে অর্জিত লাভের সংবাদে আমরা যেমন আনন্দিত হই, লোকসানের পাল্লা ভারী হলেও আমাদের দুঃখবোধ বেড়ে যায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী বিচক্ষণতায় এবং পরামর্শে নতুন নতুন উড়োজাহাজ সংগ্রহের মাধ্যমে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহর বর্তমানে একটি গর্ব করবার মতো অবস্থানে চলে এসেছে। সরকারের তরফ থেকে ইতিমধ্যে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে যে, বিমানের ফ্লাইট থাকলে সরকারি কর্মকর্তারা বিমানেই ভ্রমণ করবেন। আমাদের অর্থনীতির অগ্রগতির চাকা যেভাবে ঘুরছে, যেভাবে আমাদের দেশবাসীর মাথাপিছু আয় বাড়ছে সে হিসেবে বিমান আর্থিকভাবে অনেক ভালো করার সুযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রবাসীরা যে পরিমাণ ভ্রমণ করেন তাতে বিমানের সাফল্যের সম্ভাবনা খুবই বেশি।

এখানে উল্লেখ্য যে চারটি বড় এয়ারলাইনস তাদের ব্যবসায়ের বড় একটা আয় করে বাংলাদেশি যাত্রীদের পরিবহন করার মাধ্যমে। আমাদের আশা থাকবে, সম্মানিত যাত্রীগণ যদি সেবায় কোনো ঘাটতি না পান কিংবা টিকিটের দামও যদি প্রায় একই রকম হয়, তাহলে নিজস্ব এয়ারলাইনসকে প্রাধান্য দেবেন।

যেহেতু বিমান তার সেবার প্রতিটি খাতকে ঢেলে সাজাচ্ছে, আমি আশা করব, সার্বিকভাবে বিমানের সেবা যে কোনো বিমান সংস্থার সমকক্ষ হবে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাকে ছাড়িয়ে যাবে।

বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকায় স্থবিরতা এলেও মুজিব জন্মশতবর্ষকে ঘিরে মহান বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ বিমান বহুদূর এগিয়ে যাবে—এই প্রত্যাশা রইল।

লেখক :চেয়ারম্যান, বিমান পরিচালনা পর্ষদ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও সাবেক সিনিয়র সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

Facebook Comments

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here