কি এমন চাকরি: মৃত্যুর খবরেও বাড়ি পৌছাতে পারি না

0
168
#

নিজস্ব প্রতিবেদক

কি এমন চাকরি করি যে, প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরেও সময়মত বাড়ি পৌছাতে পারিনা। আসলে চাকরির দোষ কি!! হয়তো সৃষ্টিকর্তাই এভাবেই লিখে রেখেছেন। না হলে বড় বোনের মৃত্যু সংবাদ শুনতে হয়েছে এক সেমিনারে বসে। আর দাদা সংবাদ শুনতে হলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট সংলাপে বসে।দাদা কিনবা বোনের দাফনে অংশ নিতে পারিনি।আমরা তো সংবাদ  শ্রমিক। কাজ করেই আমাদের পরিচয়। আমাদের টিকে থাকা।

#

আজ বুধবার রাতে সময় টেলিভিশনের রিপোর্টার বেলায়েত হোসাইন ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি লেখা পোস্ট করে লিখেছেন কিছু কথা। পোস্টে যা লিখেছেন তা হুবহু তুলে ধরা হলো:

সেদিন রাতে নির্বাচন কমিশন গঠণ ইস্যুতে বঙ্গভবনে মিটিং চলছিল। আমি এসাইনমেন্টটা শেষ করেই অফিসের নির্দেশমত বঙ্গভবন থেকে সোজা ধানমণ্ডিতে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহাদীন মালিকের সাক্ষাতকার নিতে হবে। সাথে ছিলেন আমাদের ভিডিও জার্নালিস্ট শেখ নুরুল ইসলাম। অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখার পর শাহদিন মালিক তার চেম্বারে আসলেন। নুরুল ক্যামেরা সেট করলো।  ইন্টার্ভিউটা এই শুরু করবো, তার ঠিক ২ মিনিট আগে খবর এলো নুরুলের বাবা আর নেই।

নুরুল কাঁদতে কাঁদতে আমাকে বলছিল, বেলায়েত ভাই আমি কাজটা শেষ করে যাই। এই ইন্টার্ভিউটা পরে তুমি তো নাও পেতে পারো।  আমি বললাম, নুরুল তুমি কি পাগল হয়েছ?? শোনো এই ইন্টার্ভিউ না নিতে পারার জন্য যদি আমার চাকরিও চলে যায়, তাতে আমার আফসোস নেই। তোমার এখন বাড়ি যাওয়া উচিৎ।

কোনরকম শান্তনা দিয়ে নুরুলকে সেদিন পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। শাহদিন মালিককে বললাম, আমার সহকর্মীর বাবা মারা গেছেন। আপনি যদি সময় দেন, আমি আরেকজনকে রিপ্লেস করবো। আর না হলে ইন্টার্ভিউটা নেয়া হবে না। শাহদিন মালিক আমাকে সময় দিলেন। অফিস থেকে আরেকজন ভিডিও জার্নালিস্ট পাঠানো হলো। সেদিনের মত কাজটা সম্পন্ন করে অফিসে ফিরেছিলাম।  আজ ৭ জানুয়ারি। নুরুলের বাবার মুত্যুবার্ষিকী।

নিয়তি। তার ঠিক পরের বছর ভোট সংলাপের টকশো করতে আমি যখন উত্তরবঙ্গের ৩৯টি সংসদীয় আসন ঘুরছিলাম। তখন এই নুরুলই ছিল আমার সফর সঙ্গী। আমরা রংপুর থেকে বগুড়ায়, বগুড়া থেকে নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর হয়ে পাবনায়। পাবনার ৪টি পর্বের টকশোর শ্যুটিং শেষ করে নতুন সেট ডিজাইন হচ্ছিল সুচিত্রা সেনের বাড়িতে।

সামনে চারটি ক্যামেরা তাক করা। এর মধ্যে দুটোই আমার দিকে। একটিতে ফ্রেম করছিল নুরুল। আমি উপস্থাপকের চেয়ারে বসা। আমার দু’পাশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুইজন নেতা। বাড়ি থেকে টানা কয়েকবার ফোন আসতে শুরু করলো হঠাত। প্রোডাকশন এসিস্টেন্ট ফোনটা আমার হাতে দিয়ে রিসিভ করতে বললেন। উত্তপ্ত দুপুরে তখন গা পোড়া রোদ্দুর। ভালো করে আকাশের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না। চোখগুলো ঝাপসা হয়ে আসছিল। মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠে জুমা’র আহবান।

ফোনে কথা বলা শেষ করে আমি উপস্থাপনায় মনোনিবেশ করলাম। ক্যামেরা ক্লোজ ধরে নরুল আমাকে বললো, বেলায়েত ভাই তোমার চোখটা টিস্যু দিয়ে মুছে ফেলো। টলমল করছে।

ওই যে উপস্থাপকের চেয়ারটিতে বসে আপনজনের মৃত্যুর খবর শুনতে হবে, ভাবিনি কখনো। আমার দাদার মৃত্যু সেদিন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করেয়েছিল আমাকে। হয়তো দুর্ভাগ্য। কিংবা ওটাই নিয়তি। সেদিনের মত চালিয়ে নিয়েছিলাম এই বলে- “ভোট সংলাপে স্বাগত জানাচ্ছি আমি বেলায়েত হোসাইন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই সংলাপে আমাদের আজকের পর্ব পাবনা-………”

দাদার দাফনে অংশ নিতে পারিনি। পরদিন সিরাজগঞ্জ জেলার সব কয়টি আসন কাভার করে ঢাকায় ফিরলাম। স্বজনদের কাছে খানিকটা অপরাধীও বনে গেলাম। কি এমন চাকরি করি যে, প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরেও সময়মত বাড়ি পৌছাতে পারিনা। আমি বললাম, চাকরির দোষ কি!! হয়তো সৃষ্টিকর্তাই এভাবেই লিখে রেখেছেন। না হলে তার পরের বছর বড় বোনের মৃত্যু সংবাদও কেন শুনতে হবে কোনো এক সেমিনারে বসে।

তবু আমি, নুরুল কিংবা আমরা। আমরা তো শ্রমিক। সংবাদ শ্রমিক। কাজ করেই আমাদের পরিচয়। আমাদের টিকে থাকা।

নুরুলের বাবা তার ওপরে রাগ করেছে কিনা জানিনা। আমার দাদা বোধহয় এখনো অভিমান করে আছেন আমার ওপর। আর বোনটা… তবে সেদিন থেকে নুরুলকে আমার আপন ভাই মনে হয়। ভীষন আপন।

লেখক: বেলায়েত হোসাইন, রিপোর্টার, সময় টেলিভিশন।

Facebook Comments

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here