প্রণোদনা বাস্তবায়নে ভাটা

0
83
#

বিশেষ প্রতিবেদক

করোনা মোকাবেলায় সরকার ঘোষিত ২১ টি প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ পেতে বড় উদ্যোক্তাদেরঋণ বিতরণ বাড়লেও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণে অনিহা রয়েছে ব্যাংকগুলোর। বড় ঋণে বিতরণের হার প্রায় ৯০ শতাংশ হলেও ছোট ঋণে অগ্রগতি মাত্র ৩২ শতাংশ। কিন্তু দুই-একটি ছাড়া ঋণ বিতরণ হারও সন্তোষজনক না হওয়ায় ডিসেম্বরের মধ্যে ৯০ শতাংশ প্রণোদনা বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

#

বিশ্লেষকদের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে অর্থনীতিতে আরো বেশি প্রভাব ফেলতে পারে। নানা অজুহাতে ব্যাংকগুলো ছোট ঋণ বিতরণে আগ্রহ দেখায় না। অথচ এই খাতে একদিকে কর্মস্থানের সুযোগ বেশি অন্যদিকে ঋণ খেলাপি হওয়ার নজিরও খুবই কম। করোনা সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোর উচিত বড় উদ্যোক্তাদের চাইতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোক্তাদের পাশে দাঁড়ানো।

যদিও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব বেশি ক্ষতি হয়নিবলে মনে করেছেন তারা। তবে করোনার ক্ষতি মোকাবেলায় বড় উদ্যোক্তাদের চাইতে ছোট উদ্যোক্তাদের যে কোন ভাবেই সচল রাখার পরামর্শ সংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের যে কোন উপায়ে সচল রাখতে হবে। এ শিল্পের মাধ্যমে অনেক লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। সুতরাং যেকোন উপায়ে এদেরকে চালু রাখতে হবে। কিন্তু আপসোসের বিষয় হলো এ টাকাগুলো ঠিকমতে পৌছানো সম্ভব হচ্ছেনা। এর মূল কারণ হতে পারে ব্যাংক এদেরকে চেনে না।

সাবেক গভর্নর বলেন, ব্যাংকগুলো বড়দেরব্যালেন্সসীট বুঝে কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বুঝা বা চেনা সম্ভব হচ্ছেনা। এটা একটা বড় বাঁধা । সেজন্য ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান ঋণ দিতে পারে এসব প্রতিষ্ঠানের সাথে একত্রিত করা উচিত। যেমন পিকেএসএফ এর মত প্রতিষ্ঠান যে টাকা নিয়ে তার অংশীদারদের মাধ্যমে গ্রামে গঞ্জে ঋণ দিতে পারে। বড় বড় এনজিওরা যদিও তাদের জন্য প্রণোদনা রাখা হয়েছে কিন্তুপরিমাণে অনেক কম। এসব জায়গাগুলোতে উচিত প্রণোদনার পরিমাণ বাড়ানো। সেই সাথে ব্যাংকগুলোর যেসব ব্রাঞ্চ রয়েছে তাদেরকেও উচিত টার্গেট দিয়ে দাওয়া যাতে করে ঋণের পরিমাণ বাড়াতে পারে।

তিনি আরো বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণগুলো ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করতে বলা হয়েছে,এটা মনে হয় সম্ভব হচ্ছেনা। এটা অন্তত জুন মাস পর্যন্ত বাড়ানো উচিত। তা না হলে জোর করলে পরে দেখা যাবে ঋণগুলো অপাত্রে যাচ্ছে।সুতরাং ঋণগুলো ফেরৎ দিতে ১ বছরের মধ্যে বলা হয়েছে কিন্তু করোনা তো এখনও বিরাজমান।  এতচাপ দিলে তারা পারবেনা। আমি মনে করে প্রণোদনার ঋণ বিতরণে সময় বাড়ানো উচিত, সেই সাথে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা, এবং ঋণগুলো ফেরত আনতে অন্তত দুই বছর সময় দেয়া উচিত।

সূত্রে জানা যায়,  করোনাভাইরাস সঙ্কটে সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বড় উদ্যোক্তারা ঋণে ভাসলেও ছোট উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণ এখনও বাড়ানো যায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকার যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছিল, ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৯ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা বিতরণের জন্য অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিতরণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখো যায়, ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায়  বড় উদ্যোক্তাদের ঋণ বিতরণের লক্ষমত্রা প্রায় শেষের দিকে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, শিল্প ও সেবা খাতের ৩৩ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে বিতরণ করা হয়েছে (৩০ নভেম্বর পর্যন্ত) ২৯ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ প্রণোদনা প্যাকেজের ৮৮ দশমিক ১৯ শতাংশ ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

অপরদিকের সরকার ঘোষিত প্যাকেজ বাস্তবায়নের ধীরগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন খোদ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রণালয় আয়োজিত কর্মসৃজন ও গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন বিষয়ে এক সেমিনারে বাংলাদেশ ব্যাংক গবর্নর ফজলে কবির বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে প্রণোদনার সব ঋণ বিতরণ করা না গেলেও, অন্তত ৯০ ভাগ লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে কেন তারা অনাগ্র পোষণ করছেন তার ব্যাখা দিয়েও গভর্নর বলেন, অনুমোদিত সাড়ে সাতশ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বড় কয়েকটি ছাড়া, বাকিরা ঋণ ছাড়ে আগ্রহী নয়। কেননা তারা মাঠপর্যায়ে ঋণ দিচ্ছে ২০ শতাংশ সুদে। বিপরীতে প্রণোদনার ঋণের সুদ ৯ শতাংশের মধ্যে। আর তাই ঋণ দিতে খুব একটা উৎসাহী নয় তারা।

এদিকে মেয়াদ বাড়িয়েও কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে প্রণোদনা বিতরণ পুরোপুরি হয়নি। কৃষি খাতে বিতরণের মেয়াদ চলতি মাসে শেষ হলেও বিতরণ হয়েছে মাত্র অর্ধেক। এক মাসের মধ্যে বাকি অর্ধেক বিতরণ করতে হবে। একই পরিস্থিতি হয়েছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের প্রণোদনা বিতরণের অবস্থাও। কৃষি খাতের জন্য সরকার ঘোষিত পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ বিতরণের সময়সীমা সেপ্টেম্বর থেকে তিন মাস বাড়িয়ে ৩১ ডিসেম্বর করা হয়েছে। কিন্তু নভেম্বর পর্যন্ত অনুমোদন করা হয়েছে ২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে ২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। ১ লাখ ৫ হাজার ৪২৭ জন কৃষক ও কৃষি ফার্ম ঋণ পেয়েছে। বাকি এক মাসের মধ্যে প্রণোদনার ২ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা বিতরণ করা লাগবে।

সূত্রে আরো দেখা যায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৬৫টি আবেদন পাওয়া গিয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি আবেদনের বিপরীতে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। ১ হাজার ১৩৫ কোটি নভেম্বর পর্যন্ত ৫৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে । অবশিষ্টগুলো অনুমোদনের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও জানা যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণ দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে। বিশেষ করে ছোটদের ঋণ দিতে বারবার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যেই লক্ষমাত্রা অনুযায়ী ঋণ বিতরণের হবে। তবে করোনায় যেহেুতু বিরাজমান এক্ষেত্রে ঋণ বিতরণের সময় বাড়ানো যায়কিনা তাও ভাবা হচ্ছে।

টাইমস রিপোর্ট/বিএইচ/নীল

Facebook Comments

উত্তর দিন

Please enter your comment!
Please enter your name here